যেভাবে অভিনেতা হয়েছেন নিশো












আফরান নিশো। সময়ের জনপ্রিয় অভিনেতা।
জীবনে অনেক কিছুই হতে চেয়েছিলেন শুধু হতে চাননি অভিনেতা। ২০০৩ সালে মডেলিং দিয়ে ক্যারিয়ারের যাত্রা শুরু করলেও ২০০৬ সালে নাটকে অভিনয় শুরু করেন। প্রথম নাটকে অভিনয় করে নিজেই নিজের ওপর বিরক্ত হয়েছিলেন। ছেড়ে দিতে চেয়েছিলেন এ জগত। এখন সেটাই তাকে বেঁধে রেখেছে। নিজের ক্যারিয়ারের শুরু থেকে খুঁটিনাটি বিষয় নিয়ে বলেছেন এই অভিনেতা।

অভিনেতা ছাড়া কি হতে চেয়েছিলেন?
অভিনেতা হওয়ার কোনো ইচ্ছাই ছিল না। আমি অভিনেতাই হতে চাই চাইনি। অথচ দেখেন আমি এখন অভিনয়ের কাজটাই করে যাচ্ছি।
আমার শখ ছিল পাইলট হবার। তারপরে শখের স্থানে যুক্ত হলো মাল্টিন্যাশনাল কম্পানিতে জব করবো। একটা সময় আমি মাল্টিন্যাশনাল কম্পানির জবের প্রস্তাব পেলাম। তখন আর সেটা গ্রহণ করিনি। ২০০৬ সালে যখন লাক্সের উপস্থাপনা করি তখন যখন ইউনিলিভারের মাহতাব ভাই আমাকে তাঁদের কম্পানিতে জবের প্রস্তাব দিলেন। আমি করলাম না। কেননা তখন আমি শোবিজে ঢুকে গেছি। অথচ এরকম কোনো পরিকল্পনাই ছিল না। কিছুই না হলে বাবার ব্যবসা দেখাশোনা করবো। কিন্তু দেখছেনই তো আমি এখন কি করছি!

অভিনয় ক্যারিয়ারের শুরুর গল্পটা বলেন
আগে মডেলিং ক্যারিয়ারের গল্পটা বলি, না হলে ধারবাহিকতা থাকবে না। আমাদের পাড়ায় শাম্মী আপু নামের একজন ছিলেন। তিনি আইসটুডেতে জব করতেন। তিনি একদিন বললেন, তোমার কয়েকটা ছবি তুলে দাও। এরপর জার্নালিস্ট ফারিয়া মুন্নী আপার সাথে পরিচয় হলো। তিনি সাপ্তাহিক ২০০০ এ ছিলেন। উনি আমাদেরকে সহযোগিতা করলেন। একদিন মুন্নী আপা ডাকলো, গেলাম। তিনি ছবি তুললেন। তিনি বললেন ছবিগুলো বেশ ভালো হয়েছে। সেখানে একটি সার্কেল তৈরি হলো, যারা বিভিন্ন স্থানে স্ক্রিন টেস্ট দিচ্ছিল। আমি কোনো জিনিসকে ভয় পাই না। আমারও কি মনে হলো, আমিও স্ক্রিন টেস্ট দেওয়া শুরু করলাম।

এভাবেই একদিন অমিতাভ রেজার কাছে স্ক্রিন টেস্ট দিলাম। প্রথম কাজ করলাম মেরিলের। প্রথম বিজ্ঞাপন। আমার টিভিসির গুরু অমিতাভ রেজা। শুরুটা অবশ্য ভালো ছিল না, আমি ছবিটবি নিয়ে যাইনি। অমিতাভ রেজা বিরক্ত হলেন। তারপরেও কি মনে করে আমাকে কাজটা দিলেন। এজন্য তিনি ক্লায়েন্টের সাথে যুদ্ধ করেছেন। কেননা আমার চুল দাড়ি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হচ্ছিল না ওই বিজ্ঞাপনে। অথচ অমিতাভ রেজা আমাকে চুল দাড়ি দেখেই আমাকে সিলেক্ট করলেন। পরে অবশ্য আফজাল ভাই আমাকে দিয়ে করালেন ডাবল কোলার বিজ্ঞাপন। আমার বিপরীতে নায়িকা শাকিবা ছিলেন। এই তো এভাবেই শুরু।

তাহলে অভিনয়ের গুরু কাকে বলবেন?
আমি তখন মডেলিং ক্যারিয়ার শুরু করলেও অভিনয়টাকে কোনোভাবেই গ্রহণ করতে পারছিলাম না। এতোসময় ধরে মানুষ কী করে? নাটক নিয়ে এই আমার ভাবনা। গাজী রাকায়েত ভাইয়ের সাথে পরিচয় হয়েছিল। তিনি আমাকে বোঝাচ্ছিলেন আসলে অভিনয়টা একেবারে ভিন্ন জিনিস। অপূর্ব আর আমি তখন ক্লোজ বন্ধু। আমরা ২৪ ঘণ্টা একসাথে থাকতাম। সে আসে ২০০৫ সালে ইউ গট দ্য লুক দিয়ে।   আমাদের বন্ধুত্ব হয়ে যায়। কেননা দুজনেই মডেলিং ক্যারিয়ার নিয়ে ব্যস্ত। সে অবশ্য নাটকে অভিনয় শুরু করে দিয়েছিল। সেই আমাকে একদিন নিয়ে গেল রাকায়েত ভাইয়ের সেটে।

রাকায়েত ভাইয়ের সাথে আমাকে অপূর্ব পরিচয় করিয়ে দিল। রাকায়েত ভাই আমাকে বলল দেখ তোর বন্ধু তো ভালো কাজ করতেছে। সুইটির সাথে কাজ করতেছে। সেটে দেখলাম এটিএম শামসুজ্জামান, সুইটি, মোশাররফ করিম। রাকায়েত ভাই পরিকল্পনা করে 'ঘরছাড়া' নাটকে একদম নতুনদের নিয়ে কাজ করছিলেন। আমরা যারা মডেলিং-এ ভালো করছিলাম রাকায়েত ভাই তাদের একত্রিত করলেন। সেই ঘড়ছাড়া দিয়েই শুরু অভিনয়। প্রথম নাটক দেখে নিজেই অবাক, আমি এতো বাজে অভিনয় করি। এরপর ধীরে ধীরে অভিনয়টা আয়ত্তে আসে।   নাটকের গুরু আমার রাকায়েত ভাই।

নাটকে ভালো করলেন কীভাবে?
নাটকে নিজের অভিনয় দেখে নিজেই বিরক্ত হলাম। ফোন বন্ধ করে দিলাম। এভাবেই টানা ১৫ দিন ফোন বন্ধ করে দিয়েছি। দেখা গেল আমাকে ফোন দিয়ে কেউ পাচ্ছে না। একদিন অমিতাভ ভাই আমাকে ডাকলেন। বললেন ফোন বন্ধ কেন? আমি বললাম কি করবো ভাই, এতো বাজে অভিনয় করি আমি। মন মেজাজ ভালো নেই। এভাবেই কে যেন বলল- মডেলরা আসলে অভিনয় পারে না। নানা উদাহরণও দিল তখন।

হুট করে মনে হলো কেন অভিনয় পারবো না? কি আছে এতে? এরপর শুরু করলাম। আমার গোল সেট করলাম, ভিশন সেট করলাম। হুমায়ূন ফরিদীকে আমার আইডল মেনে অভিনয় শুরু করলাম। রাকায়েত ভাইকে বললাম, আমি অভিনেতা হতে চাই। রাকায়েত ভাই আমাকে পরামর্শ দিলেন। আমি অভিনয়শিল্পী হতে শুরু করলাম।

তাহলে আপনার আদর্শ হুমায়ূন ফরিদী?
হুম অবশ্যই। এখন মনে হয়- আহা ফরিদী ভাই যদি বেঁচে থাকতেন তাহলে বলতাম দেখেন তো নামার অভিনয় হচ্ছে কি না। এখন যে আমি ভালো করতেছি, উনি বেঁচে থাকলে একবার হলেও ডেকে বলতেন। ফরিদী ভাইয়ের সাথে আমার খুব ভালো একটা সম্পর্ক তৈরি হয়ে গিয়েছিল। আমি তাকে সেরা অভিনেতা মনে করি। অনেকেই বলে আমার পরিবর্তন হয়েছে হুট করেই। হয়তো আমার ভিশন সেট করতে পেরেছিলাম বলে এখন আপনার সামনে নাটকের শুটিং এর সেটে বসে কথা বলছি।

আপনার সহশিল্পীদের সাথে কাজের অভিজ্ঞতা কেমন, সামঞ্জস্য হয় কার সাথে বেশি?
সহশিল্পী হিসেবে যদি বলেন, তার আগে বলতে হবে আমি তো আসলে হিরো হতে আসিনি। আমি এসেছি অভিনেতা হতে। তারপরেও যদি বলেন, আমার সানজিদা প্রীতির সাথে কাজ করতে ভালো লাগে। কো-আর্টিস্ট হিসেবে যথেষ্ট ভালো। সবচেয়ে বড় কথা তার সাথে আমি আলোচনা করি। সে উচ্চারণে ভুল হলেও ধরিয়ে দেয়। পারফরম্যান্সের দিক থেকে সিঙ্কটা ভালো হয়  অর্ষা, তিশার সাথে। এছাড়া রিচি সোলায়মান, নাদিয়া ছিল তাদের সাথে ভালো কাজ হতো। মেহজাবিন, শখ, শার্লিন এদেরকে জিজ্ঞেস করলেও বুঝতে পারবেন আমি প্রচুর আলোচনা করি। চরিত্রের ভেতরে ঢুকতে হবে। শুধু আমাকে না, সহশিল্পী যিনি থাকবেন তিনিও যেন অভিনয়ে প্রবেশ করেন।

যদি বলা হয় জনপ্রিয় নাটক এবং মানের নাটক- এই দুটোর মধ্যে পার্থক্য করবেন কীভাবে?
পপুলারিটি আর ক্রিটিক্যালি দুটো এক হবে আমি বিশ্বাস করি না। বিলো স্ট্যান্ডার্ড কাজও মানুষ অনেক সময় অনেক বেশি দেখতে পারে। আবার অনেক মানসম্মত নাটকও মানুষের নিকট পৌঁছে না। এটা অনেক ক্ষেত্রে নির্ভর করে মার্কেটিং এর ওপরে। এটার ক্ষেত্রে অনেক লজিক আছে বুস্ট আপ কিংবা প্রচারণা। অনেক পরিচ্ছন্ন নাটক ডিরেক্টর কিংবা আর্টিস্টদের প্রচারণার জন্য সেই লেভেলে পৌঁছায় না। কিন্তু ভালো কাজ একটি গুড অ্যাটেন্ড। তবে ভাইরাল ওয়ার্ককেও সাকসেস না বলে উপায় নেই।

অভিনেত্রী শখের সাথে 'ইয়েস' নাটকের শুটিং সেটে

এখন যে নাটকের শুটিং করছেন সেটার অন্তর্নিহিত গল্পটা একটু বলবেন
আমরা এর আগে একটি নাটক করেছিলাম নাটকটির নাম 'নো। ' সেটাতেও আমার সহশিল্পী ছিল শখ। সেখানে ছেলেটি সবসময় 'নো' বলে। কোনো কিছু না ভেবেই বলে ফেলে নো। একটা সময় ছেলেটি অনুধাবন করতে পারে বেশি 'নো' বলাও ভালো না বেশি 'ইয়েস' বলাও ভালো না।

এমনই একটি কনসেপ্ট নিয়ে 'ইয়েস' নিয়ে আমরা পরিকল্পনা করেছি। বলা যায় 'নো' নাটকটির সাথে এই নাটকের একটা সিমিলারিটি রয়েছে। এই নাটকে একটি একটি সুবিধাবাদী ছেলের কথা বলা হয়েছে। ছেলেটি সবক্ষেত্রে 'হ্যাঁ' বলে কিন্তু কথা রাখতে পারে না। সে সবাইকে মিসগাইড করে। ইথিক্যালি সে নট ওকে। পরিবারের মা-ভাই সবাইকে হ্যাঁ বলেও কথা রাখে না। অফিসে এক মেয়ের সাথে পরিচয় হয়। সেখানেও মেয়েটির সাথে একই ঘটনাটা ঘটায়।

একদিন মা তাকে বোঝায় যে তার বাবা একজন দায়িত্বশীল মানুষ ছিলেন। কমিটমেন্ট ব্রেক করতেন না। তার সন্তান হয়ে ছেলেটার এরকম করা উচিৎ না। তার মা জিজ্ঞেস করে যে কোনো পছন্দ আছে কি না, সে বলে দেয় না পছন্দ নেই। কিন্তু আসলে তো তার পছন্দ আছে। মা 'না' শুনে অন্য এক মেয়েকে বিয়ের জন্য ঠিক করে। পুরো কেয়ারলেস ছেলে। তার কাছে কথার মূল্য নেই। মা যখন অন্য মেয়েকে ঠিক করে তখন বুঝতে পারে যে আসলে ভুল করে ফেলেছে। মা-ও এর মাঝে অসুস্থ হয়ে যায় কিন্তু মা'কে সে আসল কথাটি বলতে পারে না। যদি কোনো দুর্ঘটনা ঘটে যায়? এমন একটা ক্রাইসিস মুহূর্তে ছেলেটি বুঝতে পারে তার কমিটমেন্ট ব্রেক নানাভাবে ক্ষতি করছে। আমি বলবো না খুব যে ভালো নাটক এটা তা বলবো না, এটা নির্ভর করছে ডিরেক্টরের ওপর, তার প্রেজেন্টেশনের ওপর।

আপনার বর্তমান ব্যস্ততা সম্পর্কে পাঠকরা জানতে আগ্রহী
এখন বেশকিছু ধারাবাহিক নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করছি। সত্যি বলতে কী আমার মাসটা যদি ৩০ দিনের বদলে ৪০ দিন হতো তাহলে সবচেয়ে ভালো হতো। হাতে কাজ রয়েছে। ডিসেম্বর মাসে বেশকিছু কাজ রয়েছে। এরমধ্যে সুমন আনোয়ারের 'সুখী নীলগঞ্জ' এটা ৫২ পর্বের ধারাবাহিক। আরেকটি ধারবাহিক করছি গ্রিন বেইজড নাটক 'ট্রি ম্যান। ' এটা আউটডোরের কাজ। এখানে আমি বৃক্ষমানব। ৫ বছর ঢরে জঙ্গলে থাকি। বলা যায় সবুজের জন্য আন্দোলন। এছাড়া আরবি প্রীতমের একটি ধারবাহিকে কাজ করছি, হিমেল আশরাফের একটি গল্পে নেক্সট মাসে কাজ করবো। সামনে ভ্যালেন্টাইনের একটা প্রেশার থাকবে। এই নিয়ে ব্যস্ততা।

এতো ব্যস্ততার ভেতরে পরিবারের জন্য সময় হয়?
বাবু বড় হয়ে গেছে।   আহমেদ ওয়াহেজ নির্ভান। ওকে স্কুলে দিয়েছি, বয়স তিন বছর দুইমাস। এই যে আজ ওর স্পোর্টস ডে ছিল। ওখানে গিয়েছিলাম। ওখান থেকে সরাসরি সেটে চলে এসেছি।   তিন বছর দুইমাস। তাকে সপ্তাহে একদিন সময় দেই। যেটা হয় সকালে বের হয়ে আসি। রাতে ফিরি। অবশ্য  বাবু সকালে ঘুম ভাঙিয়ে দেয়। ওর হাত ধরে ঘুম ভাঙে। বাসায় ফিরি রাতে। তখন সে থাকে ঘুমিয়ে। যদিও ওর মা ২৪ ঘণ্টাই ওর সাথে থাকে। তারপরেও সপ্তাহের একটা দিন পরিবারের জন্য বের করতে হয়।