১৯ বছর পর

নওরীন মনির
নওরীন মনিরের শৈশবের পাঁচ বছর কেটেছে গ্রিসে। বাবা-মায়ের সঙ্গে দেশে ফেরার সময় সঙ্গীদের জন্য তাঁর শিশুমন খুব কেঁদেছিল। এর মধ্যে কেটে গেছে ১৯ বছর। চট্টগ্রামের তরুণী নওরীন এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরোনোর অপেক্ষায়। গত মাসে গ্রিসে আমন্ত্রিত হয়েছিলেন তরুণদের একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে। সে দেশে গিয়েই দেখা হয়ে গেল ১৯ বছর আগে ছেড়ে আসা তাঁর চার বন্ধুকে। ছবিও তুললেন তাঁদের সঙ্গে ঠিক ১৯ বছর আগে তোলা একটি ছবির অনুকরণে

বন্ধুদের সঙ্গে ছোটবেলায় তোলা লেখকের (পেছনে বাঁয়ে) সেই ছবি
১৯৯৪ সালের কথা। গ্রিক সরকারের বৃত্তি নিয়ে সে দেশে পড়তে গিয়েছিলেন আমার মা ও বাবা। সেটা আমার জন্মের ঠিক পরপরই। তাই আমার শৈশব কেটেছে গ্রিসেই। ছোটবেলাতেই গ্রিক ভাষা শিখেছি, তেমনি চেনা মানুষ বলতেও ছিলেন গ্রিসের প্রতিবেশীরা। আমার বাবা অধ্যাপক মনির উদ্দিন ও মা অধ্যাপক নুসরত জাহান সে দেশের অ্যারিস্টটল ইউনিভার্সিটি অব থেসালোনিকিতে পিএইচডি ডিগ্রির জন্য পড়েছেন। তাঁরা দুজনই চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক।

শৈশবের গ্রিস স্মৃতি এখনো আবছা মনে পড়ে। তবে মারিয়া, খ্রিসাভগি, আন্দ্রেয়াস কিংবা আন্থুলা মুরাতিদুর সঙ্গে বন্ধুত্বের স্মৃতি অটুট ছিল সব সময়। ওরাই তো আমার গ্রিস জীবন উজ্জ্বল করে তুলেছিল। শৈশব মাতিয়ে রেখেছিল।

আন্থুলা মুরাতিদুর বয়সে আমাদের সবার বড়। আমাদের বাসা থেকে হাঁটাপথ ছিল ওদের বাসা। বেশির ভাগ সময় কাটত ওদের সঙ্গেই।

একসময় মা–বাবার পড়াশোনা শেষ হলো। তাঁরা চলে এলেন দেশে। আমার বয়স তখন পাঁচ বছর। শুরুতে খুব মিস করতাম গ্রিসের বন্ধুদের। কারণ, দেশে এসে একদম ভিন্ন পরিবেশে নতুন করেই সবার সঙ্গে পরিচিত হতে হয়েছে।

চিঠি পাঠাত আন্থুলা মুরাতিদুর

বাবার ঠিকানা রেখেছিল আন্থুলা। দেশে ফেরার পর সে নিয়মিত চিঠি লিখত আমাকে। কিন্তু সেই চিঠি কিংবা কার্ডের মর্ম তখন বুঝতাম না। তবে তারা যে আমাকে মনে রেখেছে এবং আমার মতোই মিস করছে, সেটা বুঝতাম। তাই শুরুতে আর উত্তর পাঠানো হতো না। কিন্তু ১৯ বছর ধরে আন্থুলা আমার প্রতিটি জন্মদিনে কার্ড বা উপহার পাঠিয়ে গেছে।

একটু বড় হওয়ার পর আমিও প্রতিবছর আন্থুলা ও বাকি বন্ধুদের চিঠি পাঠানো শুরু করি। তখন মন শুধু এটাই চাইছিল—কবে দেখা হবে আবার। এ যেন অনন্ত অপেক্ষা।

খুঁজে পেলাম ফেসবুকে

২০১২ সালে ফেসবুকে অ্যাকাউন্ট খুলি। প্রথমে তাঁদেরই খোঁজে ফিরেছি। মুঠোফোনে কথা বলে একসময় পেয়েও যাই। প্রত্যেকে আমরা কত বড় হয়েছি। একদমই চেনা যাচ্ছিল না। প্রথম দেখে আবেগ ধরে রাখতে পারি না। তখন শুরু হলো আরেক অপেক্ষা। কবে ফের দেখা হবে।

অবশেষে আবার গ্রিস

অবশেষে সে সুযোগ করে দিল ব্রিটিশ কাউন্সিলের ‘ইমাজিন পিস ইয়ুথ ক্যাম্প’। মানুষের জীবনমান পরিবর্তনে কাজ করে এবং সাধারণের মধ্যে অলিম্পিকের গুরুত্ব পৌঁছে দিতে আগ্রহী এমন তরুণদের নিয়েই এই ক্যাম্প। বিশ্বের ৫০টি দেশ থেকে ৫০ জন তরুণ প্রতিনিধি এই ইমাজিন ইয়ুথ ক্যাম্পে অংশ নিয়েছিল। বাংলাদেশ থেকে বৃত্তি পেয়ে অংশ নিয়েছিলাম আমি। ২৭ আগস্ট থেকে ২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ছিল আয়োজন। তবে ৬ দিন আগেই আমি হাজির হয়েছিলাম গ্রিসে।

গ্রিসে যাওয়ার প্রস্তুতির কথা নাই–বা বললাম। সে কী উত্তেজনায় ভরা দিনগুলো! ক্যাম্পে অংশ নেওয়ার আনন্দ ছাপিয়ে মনে উঁকি দিচ্ছিল মারিয়া, খ্রিসাভগি, আন্দ্রেয়াসদের সঙ্গে দেখা হওয়ার অপেক্ষা। ১৯ বছর…।

ও বন্ধু আমার

থেসালোনিকি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ওদের অপেক্ষা করার কথা। আগেই সব পরিকল্পনা পাকাপাকি। চাপা উত্তেজনা নিয়ে বিমানের আনুষ্ঠানিকতা শেষ করেই বেরিয়ে দেখি, সবাই হাজির। বিমানবন্দরেই হয়ে গেল আনন্দের কান্না। সে অনুভূতি লেখায় প্রকাশ করা যায় না।

এই ছবি, সেই ছবি

আন্থুলার বড় বোনের বাসায় দাওয়াত ছিল আমার। ওখানেই পুরোনো অ্যালবাম ঘেঁটে পাওয়া গেল আমাদের ছোটবেলার ছবি। আন্থুলার জন্মদিনে ছবিটি তোলা হয়েছিল। তা দেখে সঙ্গে সঙ্গেই সিদ্ধান্ত হলো, ঠিক ওই ছবিটির মতো করেই আমরা ছবি তুলব। যেমন ভাবনা তেমন কাজ! ���🙂

উড়েছে দেশের পতাকা

ইমাজিন পিচ ইয়ুথ ক্যাম্পের আয়োজন হয়েছিল এথেন্সের আন্তর্জাতিক অলিম্পিক একাডেমিতে। শিক্ষামূলক কর্মশালা, খেলাধুলার মাধ্যমে সম–অধিকার ও শান্তি প্রসারের লক্ষ্য ছিল ক্যাম্পের সব আয়োজনে। আমার জন্য বাংলাদেশের পতাকা টানানো হয়েছে অলিম্পিক একাডেমির আঙিনায়। এটা দেখে অসম্ভব ভালো লেগেছে। ক্যাম্পের আনন্দময় সময়ের মধ্যে কিন্তু কেন যেন মনের কোণে বারবার থেসালোনিকি উঁকি দিচ্ছিল। আপন মানুষের কাছে এত অল্প সময় থেকে কি মন ভরে!