‘বোকা’ ফারুকীর ‘ব্রিলিয়ান্ট’ সিনেমা ’ডুব’

‘ডুবেছে’ শিরোনামে জনৈক ‘বিখ্যাত’ লেখিকা লিখেছেন ডুব সিনেমার রিভিউ। সামনে আসায় রিভিউটি পড়েছিলাম, তখনও সিনেমাটি দেখা হয়নি। কিছু ব্যক্তিগত ব্যস্ততার কারণে সিনেমাটি দেখতে বেশ দেরি হয়ে গেল। ডুব দেখার পর মনে প্রশ্ন এসেছে ‘ডুব কি সত্যিই ডুবেছে?’। কাকে আমরা বলবো ‘ডুবা’ আর কাকে বলবো ‘ভাসা’?

মানুষের মতোই শিল্পকে ‘আশরাফ’ আর ‘আতরাফ’ শ্রেণীতে ভাগ করার চেষ্টা এই বিশ্বে বিদ্যমান আছে। এই শ্রেণীভেদ করার জন্য এক ধরণের মানদণ্ডের অস্তিত্বও আছে। শিল্প যেহেতু ভৌত বিজ্ঞান নয়, এর মানদণ্ডেরও ভিন্নতা আছে। নানা ‘স্কুল অব থট’ নানা রকম মানদন্ড আমাদের সামনে হাজির করে। সেগুলো দিয়ে মেপে আমরা ঘোষণা করে দেই এটা ‘ আশরাফ শিল্প’ কিংবা ওটা ‘আতরাফ’। এক ‘স্কুল অব থট’ এর বিচারে ‘আশরাফ সিনেমা’ আরেক ‘স্কুল অব থট’ এর বিচারে হয়ে যেতেই পারে ‘আতরাফ’।

কান ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল এ পাম ডি’অর পাওয়া আব্বাস কিয়ারোস্তামির ‘টেইস্ট অব চেরি’ নিয়ে আলোচনায় বিখ্যাত চলচ্চিত্র সমালোচক রজার এবার্ট (আই এম ডি বি এর বিচারে শ্রেষ্ঠতম) তাঁরই প্রিয় দুই চলচ্চিত্র সমালোচক এর সাথে দ্বিমতের কথা উল্লেখ করেছেন। ‘সিনেমাটা একটা মাস্টারপিস’ এই মন্তব্যে তিনি তাদের সাথে দ্বিমত প্রকাশ তো করেছনই, তিনি রীতিমত এটা বলতে চেয়েছেন ওই সিনেমা দেখাটা সময়ের এক রকম অপচয়। এরকম উদাহরণ অনেক আছে। কিয়ারোস্তামির উদাহরণ এখানে দিলাম কারণ ইনি ফারুকীর প্রিয় ডিরেক্টরদের একজন।

আমি এই আলোচনায় ঢুকছি না। কারণ কতগুলো সাবজেক্টিভ মানদণ্ডের ওপর ভিত্তি করে কোনো সিনেমাকে আমি ‘আশরাফ’ বা ‘আতরাফ’ তকমা দিয়ে অন্যদের ওপর চাপিয়ে দেয়া একেবারেই অনুচিত বলে মনে করি। আর সিনেমাটির ‘শরীর’ নিয়ে আমার ব্যক্তিগত মূল্যায়নও খুব একটা করবো না এখানে, কারণ নানা পয়েন্ট অব ভিউ থেকে এই সিনেমার অনেকগুলো বিশ্লেষণ এর মধ্যেই হয়ে গেছে। আমি বরং দেখতে চাই ভিন্ন একটি দিক। এই পর্যায়ে তিনটি বিষয় একটু দেখে নেয়া যাক।

একজন মধ্যবয়সী মানুষ নিজের মেয়ের বান্ধবীর প্রেমে পড়ে তার আগের পরিবারটি ত্যাগ করে তাকে বিয়ে করা জনিত কারণে তার এবং তার পরিবারের সব মানুষের মধ্যে যে আবেগগত টানাপোড়েন অবশ্যম্ভাবী হয়ে ওঠে, সেটার মধ্যেই এক দুর্দান্ত সাইকোলজিক্যাল ড্রামা হয়ে ওঠার সব উপাদানই আছে। কিন্তু ফারুকী সেটা অজ্ঞাত কোনো ব্যক্তির জীবন না বুঝিয়ে অতি অতি জ্ঞাত একজন ব্যক্তি হুমায়ূন আহমেদকে আমাদের সামনে নিয়ে এসেছেন। হ্যাঁ, এই সিমনেমায় ফারুকী হুমায়ূন আহমেদকে বিক্রি করতে চেয়েছেন। এতে আমি কোনো দোষ দেখি না, দেশের সবচাইতে বিক্রযোগ্য মানুষটির জীবনের কোনো নাটকীয় ঘটনা বিক্রি করা যেতেই পারে।

যৌক্তিক অনুমান করাই যায় ফারুকী খুব সচেতনভাবে হুমায়ূন এর বায়োগ্রাফি বিষয়ক তর্কটি বাজারে ছেড়েছিলেন। আমরা মনে করতে পারবো হয়তো এই সিনেমার একজন অভিনেত্রী রোকেয়া প্রাচী কলকাতার স্বনামধন্য একটা পত্রিকায় ডুব যে হুমায়ূন এর জীবনের একটা অংশের ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়েছে, সেই ‘বোমাটা ফাটান’। এরপর হুমায়ূনের স্ত্রী মেহের আফরোজ শাওন এর সাথে এটা নিয়ে নানামুখী বিতর্ক, সিনেমাটির প্রচার নিষিদ্ধ করার আবেদন, সেন্সর বোর্ড কর্তৃক কিছু অংশ কর্তন, এবং সর্বশেষে মুক্তি পাওয়া, ইত্যাদি নানা বিষয় নিয়ে দেশের মূল ধারার মিডিয়া ক্রমাগত রিপোর্ট কিরে গেছে। বহু টাকা খরচ করেও ডুব সিনেমার যে প্রচারণা পাওয়া সম্ভব ছিল না, সেটা পাওয়া হয়ে গিয়েছিল একেবারেই বিনে পয়সায়। অনেকেই এই বিতর্ক সৃষ্টিকে পূর্ব পরিকল্পিত বলে মনে করছেন, এবং এমন কৌশলের সমালোচনা করেছেন। আমি করছি না সেটাও, এই ডামাডোলের যুগে মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য নানা রকম পাবলিসিটি স্টান্ট এর চর্চা আর নতুন নয় একেবারেই। হতেই পারে।

ডুব সিনেমা নিয়ে একটা টিভি অনুষ্ঠানে সিনেমাটির প্রযোজক জ্যাজ মাল্টিমিডিয়ার প্রধান জনাব আব্দুল আজিজ বলেন, জনাব ফারুকীর স্ক্রিনপ্লে পড়ে তাঁর মনে হয়েছে এই সিনেমা দেখে মানুষ কাঁদবে, আর তাঁর অভিজ্ঞতা বলে, যে সিনেমা দেখে মানুষ কাঁদে সেটা নিশ্চিতভাবেই ব্যবসা করে। এরপর তিনি দ্যর্থহীন ভাষায় ঘোষণা করেছেন, তিনি এই সিনেমা প্রযোজনা করেছেন, কারণ তিনি বিশ্বাস করেন এটা তাঁকে খুব ভালো ব্যবসা দেবে।

তিনটি ঘটনা মিলিয়ে নিলে এটা স্পষ্ট হবে ডুব সিনেমার পরিচালক এবং প্রযোজক একটা ‘সুপার ডুপার হিট’ সিনেমা বানানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।

সিনেমাটি দেখার সময় দারুন ভালোলাগার মধ্যেও বার বার মনের হচ্ছিলো ফারুকী কী ‘বোকা’! এটা কি হতে পারে কোনো ‘সুপার ডুপার হিট’ সিনেমার ভাষা? না, আমি ডুব এর ভাষাকে ‘উন্নত’ বলছি না, তবে এটা বলছি এই সিনেমার ভাষা, আমাদের বেশিরভাগ মানুষের চোখে অভ্যস্ত ক্লাসিক্যাল হলিউড ন্যারেটিভ স্টাইল এর চাইতে অনেকটা আলাদা।

জাভেদ আর মায়া বান্দরবান গেছে এক্সট্রিম লং শটে আমরা তাদেরকে দেখি কিংবা দেখি না, কিন্তু শুনি জাভেদ বলছেন তারা দু’জন স্বামী স্ত্রীর পদে চাকুরী করছেন। আমরা পর্দায় তাঁদের তীব্র ঝগড়া দেখলাম না, মান-অভিমান দেখলাম না, কিন্তু দেখলাম তাঁদের সংসার ভাঙ্গনের মুখোমুখি। আমরা আরও দেখি জাভেদ প্রচন্ড ক্ষুব্ধ হয়ে নিতুকে ঘর থেকে বের করে দেয়। এর পরই আমরা সাবেরীর ক্ষুব্ধ সংলাপে জানতে পারি জাভেদ নিতুকে বিয়ে করেছেন। এই যে প্রতিটি ঘটনা ঘটার প্রেক্ষাপট বয়ান না করে পরবর্তী ঘটনায় চলে যাওয়া, সিনেমার সম্পাদনার ভাষায় ইলিপসিস, অনেক আছে এই সিনেমায়। দর্শককেই ভরিয়ে নিতে হবে এই শুন্যস্থানগুলো। কিন্তু সিনেমাটা দেখার সময় চারপাশে ফিসফাস শুনছিলাম, তাদের অনেকের কাছেই অনেক কিছুই অযৌক্তিক, অদ্ভুত ঠেকছে।

অনেক বেশি লং শট তো বটেই, বহু এক্সট্রিম লং শট (অনেক দূর থেকে দেখা) এবং লং টেইক (না কেটে অনেক লম্বা শট) ব্যবহৃত হয়েছে এই সিনেমায়। অনুমান করি, ফারুকী ঘটনায় খুব কম ইনভলভড হয়ে ঘটনা দেখতে চেয়েছেন, এবং দেখাতে চেয়েছেন। কিন্তু সিনেমা দেখতে দেখতে যখন আমরা আরও বেশি ‘ভয়্যার’ হয়ে উঠি তখন বিষয়বস্তুর সাথে এই দূরত্ব আমাদের অনেকেই মেনে নিতে পারি না। আমরা চাই ঘটনার সাথে ভীষণ নৈকট্য। ওদিকে ক্রমাগত অস্থির হয়ে ওঠা মানুষ যতো দিন যাচ্ছে লং টেইক আর নিতে পারছে না। এজন্য মূলধারার সিনেমাগুলো প্রতি দশক পর পর আমরা দেখবো বর্তমান দশকের শটের গড় দৈর্ঘ্য আগের দশকের চাইতে কমে গেছে। একটা উদাহরণ দেয়া যাক। ১৯৩০ এর দশকে হলিউড এর সিনেমার এভারেজ শট লেংথ ছিল ১২ সেকেন্ড, যেটা এখন ২.৫ সেকেন্ড এরও কম। আমাদের অনেকেই দীর্ঘ শট নিতে পারি না। আর সেই শটে অনেক মুভমেন্ট না থাকলে তো কথাই নেই।

তেমনি আমরা অনেকেই এটাও নিতে পারি না, যে মানুষটা কথা বলছে তাকে দেখবো না, কিংবা দেখবো না দুজনের কাউকেই। ডুব এ অনেক সময় দেখা গেছে দুই জনের কথোপকথনের সময় আমরা কাউকেই দেখতে পাচ্ছি না। আমরা আঁড়ি পাতা ‘আংশিক ভয়্যার’ হয়ে সন্তুষ্ট থাকতে পছন্দ করি না, আমরা পছন্দ করি দেখে ‘পূর্ণাঙ্গ ভয়্যার’ হতে।

ডুব এ প্রচুর নিস্তব্ধতা আছে, কিন্তু ‘সাউন্ড অব সাইলেন্স’ শুনতে পারি আমরা সবাই? বা পারলেও যদি সচেতন সিদ্ধান্তে শুনতে না চাই? মূল ধারার সিনেমা এবং টিভির নাটক-সিরিয়াল যখন প্রতিটি মুহূর্ত ডায়ালগ দিয়ে এতটাই পূর্ণ থাকে যে চোখ বন্ধ করেও ‘দেখে’ ফেলা যায় আস্ত সিনেমাটা তখন এই নৈঃশব্দ্য খটকা তৈরি করারই কথা; করেছেও।

আর ছিলো হুমায়ূন এর জীবনের সাথে সিনেমাকে মেলানোর চেষ্টা করে ব্যর্থ হওয়া। সিনেমাটা হলে প্রদর্শিত হতে শুরু করার পর বার বার বলা হচ্ছিল হুমায়ূনকে মাথা থেকে সরিয়ে সিনেমাটা দেখতে। কিন্তু বেশিরভাগ দর্শক সেটা করেননি। এর দায় মোটেও দর্শকের না। হুমায়ূনকে মাথায় ঢুকিয়ে দর্শককে হলে নিয়ে যেতে চাইবো, কিন্তু এরপর বলবো ওটা মাথা থেকে সরিয়ে সিনেমা দেখো, এটা স্ববিরোধিতা।

এভাবেই নানা ফ্যাক্টর মিলিয়ে একটা প্রচন্ড হাইপ তৈরি হওয়া একটা সিনেমা দেখতে গিয়ে দর্শক নানাভাবে ধাক্কা খেয়েছে; এটা একেবারেই অনিবার্য ছিলো। আর পাহাড় পরিমাণ প্রত্যাশা নিয়ে পকেটের টাকায় টিকেট কিনে, জ্যামে নাজেহাল হয়ে, সময় ব্যয় করে হলে গিয়ে সিনেমা দেখা দর্শক ধাক্কা খাবার পর ক্ষুব্ধ হতেই পারেন। দুর্ভাগ্যজনকভাবে ফারুকী এই প্রতিক্রিয়াগুলোর প্রতি বেশ অসহিষ্ণু আচরণ দেখিয়েছেন। এর পাল্টা প্রতিক্রিয়া হয়েছে আবার। আমরা মনে রাখবো, পৃথিবীর তাবৎ শ্রেষ্ঠ পুরস্কার পাবার পরও, তাবৎ ক্রিটিকদের উচ্ছ্বসিত রিভিউ পাবার পরও কোনো সিনেমা আমার কাছে বাজে মনে হতেই পারে। এবং সেটা নিয়ে যে কোনো রকম মন্তব্য করার অধিকার আমি রাখি। সে কারণে ক্রিটিক রজার এবার্ট এর প্রায় সব ফিল্ম এনালিসিস এর সাথে আমি মোটা দাগে একমত হলেও ‘টেইস্ট অব চেরি’ সম্পর্কে তাঁর মতামত গ্রহন করি না আমি; ওই সিনেমা আমার খুব প্রিয়।

জাভেদকে হুমায়ূন বানানোর চেষ্টায় তাঁর কবরের স্থান নিয়ে দুই পরিবারের বিবাদ, শেষ দৃশ্যে সাবেরীর ভীষণ মেলোড্রামাটিক কান্না, জাভেদ এর কণ্ঠে ‘অবাংলাদেশি’ একসেন্টের বাাংলা, এরকম আরও কয়েকটা বিষয় বাদ দিলে আমার বিবেচনায় ডুব একটা ব্রিলিয়ান্ট ফিল্ম, যেটা আমাদের সিনেমার ইতিহাসে ভিজুয়াল স্টোরিটেলিং এর একটা চমৎকার মাইলফলক হয়ে থাকবে বলে আমার বিশ্বাস। শিল্পের প্রথাগত যে মানদন্ডগুলো শুরুতে নাকচ করেছিলাম, সেগুলো দিয়ে যদি বিচার করি, তাহলে ডুব নিঃসন্দেহে একটা দুর্দান্ত সিনেমা। শুরুতে করা প্রশ্নের জবাবে তাই বলি, যদি ‘হিট’ না হওয়াকে ডোবা বলি, তবে ডুব হয়তো ডুবেছে, কিন্তু ওই লেখিকা যে বিবেচনায় ডুবকে ডুবেছে বলে দাবি করেছেন, সেই বিবেচনায় ডুব আদৌ ডুবেছে বলে আমি মনে করি না। ডুব ভীষনভাবেই ভেসে আছে, ভেসে থাকবে।

কিন্তু ‘বিস্ময় আজও গেলো না আমার’ একটা ‘সুপার ডুপার হিট’ সিনেমা বানাতে গিয়ে (পারিপার্শ্বিক ঘটনা থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় এটা) এমন একটা সিনেমাটিক ল্যাঙ্গুয়েজ বেছে নেবার মতো এমন ‘বোকামী’ ফারুকী করলেন কীভাবে, যিনি এই এই সেক্টরে কাজ করছেন দীর্ঘ দুই দশক!  লেখকঃ জাহেদ-উর-রহমান

ঢাকা অ্যাটাক’ আমার জীবনের গল্প

সাদ্দিফ অভি : ঢাকা অ্যাটাক মুক্তির পঞ্চম সপ্তাহে (৩ নভেম্বর) এসেও দেশজুড়ে হাউজফুল তকমা নিয়ে শাসন করছে চলচ্চিত্রপ্রেমীদের মন। শুধু দেশে নয় সফলতার প্রতিধ্বনি মিলছে বিদেশের প্রেক্ষাগৃহ থেকেও।

স্বাভাবিক, সিনেমাটির গল্প, চিত্রনাট্য, নির্মাণশৈলী, বিষয় এবং সংশ্লিষ্টদের ‘ডাউন টু আর্থ’ মন্তব্য- জয় করে নিচ্ছে প্রায় সবস্তরের দর্শক-সমালোচকের মন। ফলে বছরের সবচেয়ে সফল এবং আলোচিত সিনেমার তালিকায় অলরেডি এক নম্বরে উঠে বসে আছে দীপঙ্কর দীপনের এই কাজটি।

আর সেই সফলতার বিহাইন্ড দ্য সিন-এ বসে আছেন সাদামাটা একজন পুলিশ অফিসার। নাম সানী সানোয়ার। পেশায় ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার। যিনি নিজের জীবনের ছোট ছোট গল্পগুলোকে একটু আধটু এদিক সেদিক করে একটি সুতোয় গেঁথে দিয়েছেন দীপনের হাতে, চিত্রনাট্যের আদলে।

বিভিন্ন চরিত্রের মাধ্যমে ফুটিয়ে তুলেছেন তার বুকে জমানো গল্পগুলো। দীপঙ্কর দীপন সেই কাগজে আঁকা চরিত্রগুলোতে প্রাণ দিয়েছেন ক্যামেরার ভাষায়।

দীপঙ্কর দীপন এবং আপনার প্রথম সিনেমা এটি। একে অপরের প্রতি ভরসার জায়গাটা কোথায় ছিল? সিনেমা তো চাট্টিখানি কথা নয়…

সানী সানোয়ার: আমাদের ভরসার জায়গাটা এরকম ছিল, যে গল্পটা তরুণ প্রজন্ম চায় সেটা আমরাও চাই। কারণ যেই ধরনের চিত্রনাট্য নিয়ে আশেপাশের দেশে সিনেমা হচ্ছে সেই গল্প আমরা পাচ্ছিলাম না। এমন ভাবনা থেকে মনে হয়েছে এখানে একটা সুযোগ আছে আমাদের। আমরা সম্মত হলাম এই ধরনের অ্যাকশন-থ্রিলার ছবি বানানো যেতে পারে।

প্রশ্ন: গল্পটি লেখার প্রক্রিয়া কেমন ছিল?

সানী সানোয়ার: আমাদের কাছে মনে হয়েছে যে, একটা বিষয়ের ওপর গল্পটা সাজাতে হলে অভিজ্ঞ এবং এই ক্ষেত্রে কাজ করার অভিজ্ঞতা আছে এমন একটা ব্যক্তির গল্প লাগবে। সেটা যে কোনও কিছুর ওপর হোক না কেন। সেক্ষেত্রে আমি দেখলাম তরুণরা কিংবা আমি নিজেও অ্যাকশন-থ্রিলার মুভি পছন্দ করি। যদি থ্রিলার বা অ্যাকশন কাহিনি লিখতে যাই তাহলে আমার কর্মজীবনের অভিজ্ঞতা এবং ঘটনাগুলোকে সুন্দরভাবে গুছিয়ে দিতে পারলে হয় তো ভালো কিছু হবে।

প্রশ্ন: কিন্তু আপনি পেশায় একজন পুলিশ অফিসার। রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা বিভাগে আপনার বিস্তর কর্মঅভিজ্ঞতা রয়েছে। সে ক্ষেত্রে প্রায় প্রতিদিনই এমন অনেক অ্যাকশন-থ্রিলার গল্পের মুখোমুখি হতে হয়। যা আপনার কাছে নিত্যনৈমিত্তিক বিষয়! সেটিকে আবার পর্দায় তুলে আনার আগ্রহ তৈরি হওয়ার কথা নয়।

সানী সানোয়ার: একমত। আমিও তাই মনে করতাম। কারণ, এমন আরও অনেক ভয়ঙ্কর এবং বাস্তব গল্প রয়েছে আমার জীবনে- যা স্বাভাবিক ঘটনা বলেই মনে করি। তবে সেসব ঘটনা যখন আমি অন্য পেশার বন্ধু কিংবা স্বজনদের সঙ্গে আড্ডায় শেয়ার করতাম বা এখনও করি, তখন সেই সাদামাটা গল্পগুলো আমার কাছে অসাধারণ হয়ে ধরা দেয়। মূলত সেখান থেকেই ‘ঢাকা অ্যাটাক’ এর চিত্রনাট্য তৈরির উৎসাহ পাই।

প্রশ্ন: পুলিশের চাকরির পাশাপাশি গল্প লেখার সময় কিভাবে করলেন?

সানী সানোয়ার: আসলে লিখতে বেশি সময় লাগে না, সময়টা লাগে চিন্তা করতে। গল্পের কাঠামো কী হবে, শুরু এবং ধারাবাহিকতা কেমন হবে- এটা ভাবতে প্রচুর সময়ের দরকার পড়ে। অফিসের ব্যস্ততার ফাঁকে, ট্র্যাফিক জ্যামে বসে কিংবা বাসায় গিয়ে সবাই ঘুমিয়ে যাওয়ার পর আবার জেগে উঠে রাতে ২-১ ঘণ্টা কাজ করা বা ছুটির দিনে পুরোটা সময় বাসায় বসে বসে লেখার কাজটি শেষ করেছি। তাও প্রায় এক বছর সময় লেগেছে।

প্রশ্ন: আপনার ব্যক্তিগত জীবন এবং অভিজ্ঞতার বড় একটা অংশ নিশ্চয়ই আছে এই সিনেমায়।

সানী সানোয়ার: নিজের পর্যবেক্ষণ কিংবা অভিজ্ঞতা নিয়ে মানুষ যখন কিছু লিখতে যায় তখন নিজের চোখে যা দেখেছে সেগুলোই ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করে। যেহেতু গল্পকার আমি, আমার জীবনে যা হয়েছে, অভিযানে যা পেয়েছি বা এধরনের পরিস্থিতিতে পড়লে আমি কী করবো বা কী হতে পারে সে বিষয়গুলো মূলত গল্পে চলে এসেছে।

প্রশ্ন: তা তো বটেই। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য অংশ বলা যায়?

সানী সানোয়ার: এটা আসলে আমার জীবনেরই গল্প। ক্যারিয়ারের শুরুতে বিসিএস দিয়ে বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিটের এসি হিসেবে জয়েন করলাম। তখন আমার টিম নিয়ে যেভাবে মুভ করতাম বা কাজ করতাম, ভেতরে যে দেশপ্রেম আর আবেগ ঠিক একই জিনিস আমি ‘আবিদ’ চরিত্রটির মধ্যে ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করেছি।

সোজা কথায়, বাস্তবের সানী আর পর্দার আবিদ- একই মানুষ। সিনেমার আবিদ আমারই বাস্তব প্রতিচ্ছবি বলা যেতে পারে। দ্বিতীয়ত বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিটের ইনচার্জ ছাড়াও গোয়েন্দা বিভাগে কাজ করতে হতো আমাদের। আমি যখন পদোন্নতি পেয়ে এডিসি হলাম তখন অনেকগুলা ইউনিটের মধ্যে একটা ছিল বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিট আর অন্যান্য টিমগুলা অপরাধ তদন্ত করতো। -বাংলা ট্রিবিউন

‘প্রতিজ্ঞা করেছিলেন শাওনকে তিনি যে করেই হোক ডোবাবেন’

নির্বাসিত নারীবাদী লেখিকা তসলিমা নাসরিন এবার জনপ্রিয় চলচ্চিত্র পরিচালক ও নাট্যকার  মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর ‘ডুব’ ছবিটি নিয়ে বিশাল এক কলাম লিখেন। জুমবাংলার পাঠকদের জন্য তা তুলে ধরা হলো…..

দিল্লির প্রেক্ষাগৃহে বাংলা ছবি বলতে গেলে আসেই না। হঠাৎ হঠাৎ খুব ভালো পরিচালকের ছবি বা জাতীয় পুরস্কার পাওয়া ছবি যাও আসে, শহরে বা শহরের বাইরে অখ্যাত প্রেক্ষাগৃহে বড়জোর এক সপ্তাহ থাকে, দিনে বড়জোর দশ বারো জন বাঙালি দর্শক ছাড়া আর কোনও দর্শক জোটে না।
কলকাতার বাংলা ছবির যদি এই হাল তবে বাংলাদেশের ছবির কী হাল হবে? বাংলাদেশের কোনও ছবি দিল্লিতে এসেছে বলে শুনিনি। তবে আমাদের চমকে দিয়ে বাংলাদেশের মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর ডুব ছবিটি দিল্লিতে এসেছে। ইরফান খানের কল্যাণেই নিশ্চয়ই এসেছে এত দূর। পোস্টার জুড়ে ইরফান খান। বাংলাদেশের ছবি দিল্লিতে– আমি তো বিষম  খুশি। ছবিতে ইরফান খান বাংলা বলেছেন—খুশির সীমা নেই আমার। আনন্দবাজারও ছবিটির অকুণ্ঠ প্রশংসা করেছে। দিল্লির সাকেত এলাকায় অনুপম প্রেক্ষাগৃহে ছবিটি দেখলাম। মাথা উঁচু করেই দেখতে গিয়েছি। যথারীতি হাতে গোনা বাঙালি দর্শক। ছবিটা দেখার সময় পাশের দর্শকদের ক্ষণে ক্ষণে বলতে শুনলাম, কী হচ্ছে কিছুই তো বুঝতে পারছি না। আসলে গল্পটা তারাই বুঝবে যারা গল্পটা আগে থেকে জানে। যারা কিছু না জেনে এসেছে, ছবির দৃশ্যগুলোকে জড়ো করে প্রচুর অনুমান এবং কল্পনা মিশিয়ে তবেই আস্ত একটি গল্প তৈরি করতে হবে তাদের।

গত তিরিশ বছর খুব ভালো সিনেমা ছাড়া আমি সিনেমা দেখি না। দেখার আগে রিভিউ পড়ে নিই, বহু বছর হলো রটেন টম্যাটোতে গিয়ে রেটিং দেখে নিই। নিশ্চিন্ত হয়েই তবে সিনেমায় যাই। আজ ডুব দেখে আমি বেশ বুঝেছি, গত তিরিশ বছরে এই প্রথম একটি ছবি আমি দেখলাম, যে ছবি আমাকে সামান্যও স্পর্শ করেনি। আমি সত্যিই বুঝে পারছি না, ইরফান খানের মতো এত বলিষ্ঠ অভিনেতা কী কারণে এমন দুর্বল চিত্রনাট্যের একটি ছবিতে অভিনয় করতে গেলেন, ছবিটির প্রযোজক হতে গেলেন! দশ মিনিটের গল্পকে দেড় ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে বলা হয়েছে, গতিকে তাই মারাত্মক রকম শ্লথ করতে হয়েছে। গল্পটা কী? একটি লোক তার বউ বাচ্চা ত্যাগ করে অল্প বয়সী একটি মেয়েকে বিয়ে করে, তারপর মরে যায়। এটিই কয়েকটি বিচ্ছিন্ন দৃশ্যকে জোড়া দিয়ে বোঝানোর চেষ্টা হয়েছে। এর ওর কান্নাকাটি আর দীর্ঘশ্বাস দর্শক শুধু দেখেছে, বেদনা অনুভব করেনি, কারণ কারও দুঃখে দুঃখী হতে গেলে, বা কারও সুখে সুখী–চরিত্রগুলোকে এবং   সম্পর্কগুলোকে যে গভীরতার ভেতর যেতে হয় তা আদৌ যায়নি।

ছবিটি দেখে আমার মনে হয়েছে লেখক হ‌ুমায়ূন আহমেদের জীবন নিয়েই ছবি করার চেষ্টা করেছেন ফারুকী, তবে কোনও মামলায় আবার না ফেঁসে যান এ কারণে হ‌ুমায়ূন আহমেদকে লেখক না বলে পরিচালক বলেছেন, নামগুলোও বদলে দিয়েছেন, গুলতেকিনের নাম রেখেছেন মায়া, শাওনের নাম রেখেছেন নিতু, আর শীলার নাম সাবেরি। আমার এও মনে হয়েছে, হ‌ুমায়ূন আহমেদের দ্বিতীয় বিয়েটি মেনে নিতে পারেননি ফারুকী, তার সব রাগ গিয়ে পড়েছে শাওনের ওপর। ফারুকী  হয়তো ।প্রতিজ্ঞা করেছিলেন শাওনকে তিনি যে করেই হোক ডোবাবেন তাই ডুব নামের এই ছবিটি বানিয়েছেন। ফারুকী কিন্তু ছবি তৈরির আগে ইঙ্গিতও দিয়ে দিয়েছেন ছবিটি হ‌ুমায়ূন আহমেদকে নিয়ে। কপিরাইট ইত্যাদি নিয়ে যথেষ্ট বিতর্কও চলেছে। এখন প্রশ্ন হলো, ছবিতে জাভেদ হাসান নামের যে হ‌ুমায়ূন আহমেদকে দেখানো হয়েছে, সেই হ‌ুমায়ূন আহমেদ কি আমাদের লেখকহ‌ুমায়ূন আহমেদ? তিনি কি শাওনের সঙ্গে সম্পর্ক গড়তে চাননি? শাওন তাকে বিরক্ত করতেন? প্রেমে শাওন পড়েছিলেন, হ‌ুমায়ূন পড়েননি? ওরকম দূর দূর করে তিনি শাওনকে তাড়াতেন? ছেলেমেয়ের জন্য হ‌ুমায়ূন কাঁদতেন, তাদের কাছে বারবার ছুটে যেতেন?

ফারুকীর এমনই অপছন্দ শাওনকে, যে, ছবিতে তিনি শাওনের সঙ্গে হ‌ুমায়ূন আহমেদের প্রেম হচ্ছে, বিয়ে হচ্ছে, শাওনের বাচ্চা কাচ্চা হচ্ছে, বাচ্চাদের সঙ্গে হ‌ুমায়ূন আহমেদ খেলছেন, স্বামী-স্ত্রী দুনিয়া ঘুরে বেড়াচ্ছেন, বিশাল বাগান বাড়িতে মহানন্দে জীবন কাটাচ্ছেন – দেখাননি।  হ‌ুমায়ূন আহমেদ জীবনে যা করতে ইচ্ছে করেছেন তাই করেছেন, রাজা বাদশাহর মতো বাঁচতে ইচ্ছে হয়েছে তাঁর, ঠিক  তেমন করেই বেঁচেছেন। এসব দেখাননি ফারুকী।  ছবিতে ফারুকী দেখাতে চাননি হ‌ুমায়ূন আহমেদের অসুখ আর তার সেবা যত্নে ব্যস্ত শাওনকে। শাওনকে দেখানো হয়েছে হ‌ুমায়ূন আহমেদের সংসার ভেঙে দেওয়া কোনও বাজে চরিত্রের স্বার্থপর মেয়ে হিসেবে, ‘অ্যাটেনশান সিকার’ হিসেবে– যে কিনা মানুষের সঙ্গে ব্যবহার জানে না, শীলার সঙ্গে প্রতিযোগিতায় হেরে গিয়ে শীলার বাবাকে বিয়ে করে শোধ নেয়, যে কিনা শীলাকে তার বাবা কিছু উপহার দিক পছন্দ করে না, যে কিনা বাড়ির কাজের লোকদের খেতে দেয় না। শাওনের প্রতিভার সামান্য কিছুও প্রকাশ করা হয়নি ছবিতে। এ অনেকটা একটা শিশুতোষ ঠাকুরমার ঝুলি, যেখানে রাজা রাণীর সুখের সংসার থেকে রাজাকে এই ডাইনি এসে উঠিয়ে নিয়ে যায়, বাকি জীবন রাণীর শোকে কাঁদতে কাঁদতে রাজা অন্ধ হয়ে যান, আর রাজার অপেক্ষা করতে করতে রানী বনবাসে যান। শিশুতোষ গল্পটির উপসংহার ফারুকী টেনেছেন এভাবে, জীবনে তারা এক না হতে পারুন, মৃত্যু তাদের এক করে দিয়েছে, তারা একে অপরের কাছে ফিরে এসেছেন, অতঃপর তারা সুখে শান্তিতে বাস করতে লাগলেন।

ছবিটি রক্ষণশীলতার চূড়ান্ত। নিতুকে সকালবেলা দেয়াল টপকে বেরিয়ে যেতে দেখা যাচ্ছে, তাতে বুঝে নিতে হবে নিতু রাতে জাভেদ হাসানের সঙ্গে ছিল। রাতে তাদের শয্যাদৃশ্য দেখানো যেত, দেখানো হয়নি। এক সম্পর্ক থেকে আরেক সম্পর্কে গড়িয়ে যাওয়ার যে টানা পোড়েন, যে বিতৃষ্ণা বা যে মোহ – তা ইরফান খান অভিনয় দিয়ে চেষ্টা করলেও নড়বড়ে চিত্রনাট্যের   কারণে বিশ্বাসযোগ্য হয়নি। মায়ার সঙ্গে জাভেদ হাসানের সম্পর্ক একসময় গভীর ভালোবাসার ছিল, তা কোনও দৃশ্যেই বিশ্বাসযোগ্য করা হয়নি।

সিনেমা তৈরি করতে গেলে, বা গল্প লিখতে গেলে, সবচেয়ে বড় যে কাজ পরিচালকের বা লেখকের, তা হলো মানুষের সম্পর্কগুলোকে বিশ্বাসযোগ্য করা, সে যে সম্পর্কই হোক না কেন। ডুব ছবিতে কোনও সম্পর্কই বিশ্বাসযোগ্য হয়নি। না মায়ার সঙ্গে জাভেদ হাসানের সম্পর্ক, না নিতুর সঙ্গে।

ছবিটিতে ইরফান খানের অভিনয়, যতটুকু করারই সুযোগ পেয়েছেন তিনি, আর সবার চেয়ে ভালো। ইরফান খানের বাংলাও, আমি আশা করিনি এত ভালো হবে। তবে ইরফানকে দিয়ে দুটো বোকা বোকা কাজ করানো হয়েছে। টেলিভিশনে যখন তিনি এবং তার দ্বিতীয় স্ত্রী সাক্ষাৎকার দিচ্ছেন, কোনও এক প্রশ্নকর্তার প্রশ্নের উত্তরে তিনি যা উত্তর দিয়েছেন তাতে না ছিল ধার, না ছিল বুদ্ধিমত্তা। আর তার এক ভক্তকে টেনে হিঁচেড়ে নাস্তানাবুদ করার পর ইরফান খান তাকে জিজ্ঞেস করেছেন কেন লোকটি ইরফান খান আর তার দ্বিতীয় স্ত্রীর সঙ্গে তোলা তার ছবি থেকে স্ত্রীকে বাদ দিয়ে  ফেসবুকের প্রোফাইল পিকচার  দিয়েছে। এ নাকি ইরফানকে রেস্পেক্ট করা নয়। আশ্চর্য, কাউকে শ্রদ্ধা করতে হলে তার স্পাউসকেও শ্রদ্ধা করতে হয় নাকি? হ‌ুমায়ূন আহমেদ হয়তো এমন আত্মম্ভরী আর বদরাগী ছিলেন। কিন্তু ছবির অন্য কোনও দৃশ্যে তা প্রকাশ পায়নি।

ফারুকি আমাকে বেশ কয়েক বছর আগে কিছু চিঠি লিখেছিলেন, আমার নারীবাদী লেখা পড়ে, লিখেছিলেন, তিনি খুব ইনফ্লুয়েন্সড। নারীবাদী ছবি বানাচ্ছেন ঘোষণা দিয়েছিলেন। কী রকম ছিল সেই নারীবাদী ছবি আমার দেখা হয়নি। তার এই ডুব ছবিতে নারীবাদের ন-ও পাইনি। পুরুষটি ভালো, পুরুষটি নিরীহ, পুরুষটি সবাইকে ভালোবাসে, সবাই পুরুষটিকে ভালোবাসে, সবার জন্য তার মন কাঁদে, আর নারীদুটোর মধ্যে একটি ঝগড়াঝাঁটি করে, সন্দেহ করে, জল তেষ্টা পেলে জল দেয় না, আরেকটি সিডিউস করে, ডিস্টার্ব করে, মাথাটা  খায়, হিংসে করে, ধন সম্পত্তি সব  দখল করে নেয়।

ছবিতে কোনও কমপ্লেক্স চরিত্র নেই, সব সাদা কালো, সব সিম্পল। সব পড়া বই। ফারুকী টেলিভিশনের জন্য হাসির নাটক বানাতেন, ওটিতেই মানায় সিম্পল সব কাহিনি, সিম্পল চরিত্র। বড় পর্দায় ছবি করতে গেলে আরও বেশি হাত পাকাতে হবে, আরও গভীর করে জীবনকে দেখতে হবে, মনোস্তাত্বিক জটিলতা আরও জানতে হবে, গল্পের বুনন শিখতে হবে, আরও বড় চিন্তক হতে হবে। যেন তেন কিছু একটা বানিয়ে দিলাম, দু’চারটে পুরস্কার জুটিয়ে নিলাম, লোকে তো খাবেই। লোকে আজকাল সব খাবার খায় না।

ক্যামেরার কাজ ছাড়া প্রশংসা করার মতো খুব বেশি কিছু নেই। ছবির একটি দৃশ্যই আমার ভালো লেগেছে, সেটি ইরফান খান আর পার্নো যখন সিগারেট ভাগাভাগি করে খায়। ওটিতেই হয়তো পরিচালক দুজনের মধ্যে দূরত্ব কমছে বোঝাতে চেয়েছেন। ষাট- সত্তর দশকে বাংলাদেশের সিনেমায় ফুলের ওপর প্রজাপতি দেখিয়ে বোঝানো হতো, নারী পুরুষ চুমু খাচ্ছে। গল্পের জরুরি নানা ঘটনাকে সিম্বল দিয়ে ডুব ছবিতেও বোঝানোর চেষ্টা হয়েছে। ঘটনা দেখাতে অপারগ পরিচালক খামোকা একটি লোকের চা খাওয়ার দৃশ্যকে লম্বা করেছেন, ফেসবুকার ভক্তের হাঁটাকে লম্বা করেছেন, তার দাঁড়িয়ে থাকাকে লম্বা করেছেন, লাশ কবরে নিয়ে যাওয়াকে, জানাজাকে লম্বা করেছেন, তিশার দাঁড়িয়ে থাকাকে, বসে থাকাকে লম্বা করেছেন। জীবনে বহু শ্লথগতির সিনেমা আমি দেখেছি, কিন্তু সেগুলো বড় উত্তেজনায় দেখেছি, মুগ্ধ হয়েছি দেখে, কারণ সেগুলো মস্তিষ্ক নাড়িয়ে দিতে পেরেছে। এই ছবিতে মস্তিষ্কে কোনও আলোড়ন তৈরি করা তো দূরে থাক, স্পর্শ পর্যন্ত করতে পারেনি। আনন্দবাজারে রিভিউয়ার ফারুকীকে তাইওয়ানিজ পরিচালক হাউ সিয়াও সিয়েনের সঙ্গে তুলনা করেছেন। খুব হাস্যকর তুলনা। সিয়েনের ছবি দেখে স্তব্ধ হয়ে বসে থাকতে হয়, নড়ার শক্তি থাকে না।  আর ফারুকীর ছবি দেখে মাথা নিচু করে দ্রুত হল থেকে বেরিয়ে আসতে হয়।

লেখক:  তসলিমা নাসরিন, কলামিস্ট

প্রসঙ্গ ডুব : এ কোন সংস্কৃতি আরম্ভ হলো আমাদের দেশে?

অনিমেষ আইচ : আমার এক বন্ধু/ বড় ভাই জাপানে গিয়েছিলেন পড়তে। তখনো জাপান দেশের আদব কায়দা ধাতস্থ করতে পারেন নাই। তো একদিন তিনি কানে হেডফোন লাগিয়ে গান শুনতে শুনতে মাঝ রাস্তা ধরে হেঁটে যাচ্ছিলেন।

হঠাৎ খেয়াল করলেন একটি গাড়ি তাকে অতিক্রম করবার সময় মৃদু হর্ন চেপে বেড়িয়ে গেলো। এর মানে হলো ধন্যবাদ তোমাকে। গাড়িটি অনেকক্ষণ আমাদের সেই বন্ধুর পিছন পিছন আসছিলো।

যাবার সুযোগ পাচ্ছিলো না বন্ধুর অসতর্ক পথ চলার কারণে। যেই মাত্র আমাদের বন্ধু নিজে সরে গেলেন তখনই তাকে ধন্যবাদ দিয়ে চলে যান গাড়ী চালক। গল্পটা বলার পেছনের উদ্দেশ্য ভদ্রতাবোধ।

এখন মূল গল্পে আসি, একজন চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসেবে আমি ব্যাপক কৌতূহল নিয়ে অপেক্ষা করছি মোস্তফা সরয়ার ফারুকী নির্মিত ‘ডুব’ দেখার জন্য। আশা করছি এ সপ্তাহের কোন এক সুবিধাজনক সময়ে সিনেমাটা দেখে ফেলবো।

কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ের বিক্ষিপ্ত দর্শকদের (অব্যশই সবাই নয়) আচরণ দেখে পূনরায় আমি হতাশ!!! এ কোন সংস্কৃতি আরম্ভ হলো আমাদের দেশে? একটা সিনেমা আপনার মন:পুত নাই হতে পারে। সেজন্য আপনি নির্মাতা-শিল্পী-কলাকুশলীর দিকে ব্যক্তিগত আক্রমণ চালানোর কি অধিকার রাখেন???

আমরা ভাত মাছ পছন্দ করি বলে কি আমরা বলার অধিকার রাখি পাঞ্জাবীদের রুটি ডাল অখাদ্য!!! রুচির ভিন্নতা থাকতেই পারে, তা বলে হিট সিনেমা মানেই কিন্তু কালোত্তীর্ন মহান সিনেমা নয়।

হলিউড রিপোর্টার, ভ্যারাইটি পত্রিকার কথা ছেড়েই দিলাম; আনন্দবাজার কি সুন্দর করে লিখেছে ‘ডুব’ সিনেমার রিভিউ।

আবারো ভদ্রতা প্রসঙ্গে বলছি, সমালোচনা করুন ভদ্রভাবে গঠনমূলক কায়দায়। সিনেমা বানায়ে কিন্তু একজন পরিচালক বিশাল কোন অন্যায় করে ফেলে নাই। আপনাদের ইদানীং কালের ভাবভঙ্গি দেখলে মনে হয় সিনেমার পরিচালক সাত খুনের আসামী কিংবা হাজার কোটি টাকা আত্নসাতের দায়ে অভিযুক্ত কোন ফেরারী।

(নির্মাতার ফেসবুক থেকে সংগৃহীত)

আমার পরবর্তী সংগীত পরিচালক বাপ্পী লাহিড়ী

বেসরকারি টিভি চ্যানেল এটিএন বাংলা ও এটিএন নিউজের চেয়ারম্যান ড. মাহফুজুর রহমান বলেছেন তার পরবর্তী গানের সংগীত পরিচালনা করবেন ভারতের প্রখ্যাত সংগীতকার বাপ্পী লাহিড়ী ও অরিজিৎ সিং। বাংলাদেশ প্রতিদিনকে দেওয়া এক সাক্ষাত্কারে তিনি আরও বলেন একটি মহল সর্বক্ষেত্রে তার উন্নতি দেখে ঈর্ষান্বিত হয়ে ফেসবুকে তার গান নিয়ে বিরূপ সমালোচনা করছে।

তার কথায় ‘এই ফালতু সমালোচনায় আমার গান গাওয়া কখনো থেমে যাবে না। গান নিয়ে আমি অনেকদূর এগিয়ে যেতে চাই। ’ ড. মাহফুজুর রহমানের বিস্তারিত সাক্ষাত্কার তুলে ধরেছেন—আলাউদ্দীন মাজিদ

ঈদে প্রচারিত আপনার একক গানের অনুষ্ঠান ‘স্মৃতির আলপনা আঁকি’ বেশ আলোচনায় এসেছে, আপনার অনুভূতি কেমন?

অবশ্যই খুব ভালো লাগছে, যখন অনুষ্ঠানটি প্রচার হয় তখন বিদেশে ছিলাম, অনুষ্ঠানটি দেখার পর সেখানকার প্রবাসী সাধারণ মানুষ থেকে এলিট পার্সনরা পর্যন্ত বলেছেন, আপনার অনুষ্ঠান খুব ভালো লেগেছে। তারা আমার গানের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। দেশেও প্রচুর সাড়া পেয়েছি, কেউ বলেনি আপনার গান খারাপ হয়েছে। এতে গানের প্রতি আমার উৎসাহ বহুগুণ বেড়ে গেছে।

নতুন গান নিয়ে শ্রোতাদের সামনে কখন আসছেন?

শিগগিরই আসছি। আমার এবারের গানের সংগীত পরিচালনা করবেন ভারতের বিখ্যাত সংগীতকার বাপ্পী লাহিড়ী ও অরিজিৎ সিং। তাদের সঙ্গে এ ব্যাপারে আলাপ হয়েছে।

আপনার গান নিয়ে ফেসবুকে আলোচনা-সমালোচনা দুটোই হয়েছে, বিষয়টি কীভাবে দেখছেন?

প্রশংসাটাই বেশি হয়েছে। যারা সমালোচনা করেছে একটি বিশেষ মহলের উসকানিতে তারা এটি করেছে। তারা কখনই আমার ভালো চায় না। তাদের ঈর্ষা হলো মাহফুজুর রহমান টিভি চ্যানেল, গান, গল্প থেকে শুরু করে সব ক্ষেত্রেই কেন উন্নতি করছে। তাকে কীভাবে পচানো যায়। এই অপচেষ্টায় আমার পথরোধ করতে আদাজল খেয়ে নেমেছে এই মহলটি। যে যত সমালোচনা করুক আমার কোনো কাজ কেউ ঠেকাতে পারবে না। আমার দুঃখ যারা সমালোচনা করেছে তারা কেউই গঠনমূলক সমালোচনা করেনি। তারা নোংরামি করেছে। তারা যদি বলত আপনার সুর, তাল, লয় বা গায়কীতে ভুল ছিল তবে তা মেনে নিয়ে শোধরানোর চেষ্টা করতাম। কোনো সংগীত পরিচালক, শিল্পী বা প্রখ্যাত সংগীতকার এখন পর্যন্ত বলেনি, আপনার গান ভুল ছিল। আবারও বলছি, যারা আমার গান নিয়ে সমালোচনা করেছে তাদের আমি চ্যালেঞ্জ দিচ্ছি আমাকে তারা দেখাক কোথায় আমার ভুল।

নির্বাসিত লেখিকা তসলিমা নাসরিনও আপনার গানের সমালোচনা করেছেন, কী বলবেন?

তসলিমা নাসরিনকে বলব আপনি গানের লিরিক, তাল, লয় করে দেখান, তারপর আপনার সমালোচনা আমি মেনে নেব। আমার কথা হলো কেউ যদি ঈর্ষান্বিত হয়ে আমার বিরুদ্ধে কথা বলে তাদের মুখ আমি বন্ধ করতে পারব না, আমি আমার কাজ নিয়ে এগোব এবং প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে যাব।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক নিয়ে আপনার দৃষ্টিভঙ্গি কেমন?

বর্তমানে এর ভালো ব্যবহারের চেয়ে মন্দটিই বেশি হচ্ছে। এতে সমাজে অনাচার বাড়ছে। রাত জেগে ছেলেমেয়েরা চ্যাটিং করে সকালে ঠিকভাবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যেতে পারে না। ফেসবুকের মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের মধ্যে নোংরামি, ব্ল্যাক মেইলিংয়ের মতো নেতিবাচক ঘটনা অহরহ ঘটছে। ইদানীং ফেসবুকে ব্লু হোয়েল নামক একটি গেম চালু হয়েছে। যার ফলে ছেলেমেয়েরা আত্মহত্যা পর্যন্ত করছে। তাই অভিভাবকদের উচিত সন্তানদের প্রতি নজর দেওয়া আর সরকারের কাছে অনুরোধ ফেসবুক নিয়ন্ত্রণ করুন। না হলে দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম বলে কিছুই থাকবে না। রাত ১২টার পর ফেসবুক বন্ধ করে দেওয়া খুবই জরুরি। এক্ষেত্রে একটি কথা বলতে চাই, চীনে কিন্তু ফেসবুক নেই। তাই বলে তারা কী উন্নয়নে পিছিয়ে পড়েছে নাকি আরও এগিয়ে যাচ্ছে। বিষয়টি সবাই ভেবে দেখলে ভালো হয়।

গানের প্রতি উৎসাহিত হলেন কীভাবে?

ছোটবেলা থেকেই গানের প্রতি দুর্বলতা ছিল। বাবা গান খুব পছন্দ করতেন। তিনি প্রখ্যাত শিল্পীদের গানের রেকর্ড নিয়ে আসতেন। বাসায় প্রচুর গানের রেকর্ড ছিল, যেখানে প্রখ্যাত কোনো শিল্পী বাদ ছিলেন না। পাশাপাশি খ্যাতিমান লেখকদের বিশাল বইয়ের ভাণ্ডার গড়ে তুলেছিলেন বাবা। আমার দুই বোনকে গান শিখানোর জন্য দুজন শিক্ষক এবং দুজন যন্ত্রবাদক রেখেছিলেন। আমাকেও বাবা বোনদের সঙ্গে গান শেখাতে বসাতেন। এতে গানের সঙ্গে মিতালিটা আমার জন্য খুবই সহজ হয়ে পড়ে।

গানকে বলা হয় গুরুমুখী বিদ্যা, গুরুর দীক্ষা ছাড়া ভালো গাওয়া সম্ভব হয় না, এ কথার সঙ্গে আপনি কী একমত?

গলা হচ্ছে আল্লাহ প্রদত্ত। গলা না থাকলে গুরু যেমন কিছু করতে পারে না তেমনি গুরু ছাড়া গান হয় না। গানের জন্য নিয়মিত রেওয়াজ দরকার। আমি ২০ বছর ধরে সংগীত চর্চা করে আসছি।

আপনার গানের গুরু কে?

আমার এই গায়ক হয়ে ওঠার পেছনে গুরু হিসেবে মান্নান মোহাম্মদের অবদান সবচেয়ে বেশি। তাকে ধন্যবাদ জানাই তিনি ধৈর্যসহকারে গান শিখিয়ে আমাকে এতটা পথ নিয়ে এসেছেন, তাকে আমি আমার গানের গুরু মানি।

ভারতের প্রখ্যাত সংগীতকার বাপ্পী লাহিড়ী আপনার গানের প্রশংসা করেছেন বলে শুনেছি, এ বিষয়ে কিছু বলবেন—

হ্যাঁ, বাপ্পী লাহিড়ীর মতো বিখ্যাত এই সংগীত ব্যক্তিত্ব আমাকে বলেছেন গান সম্পর্কে আপনার এত জ্ঞান হলো কীভাবে। আসলে আমি যখন স্টুডিওতে তার গান রেকর্ডিংয়ের সময় বসতাম তখন বলতাম বাপ্পী দা এখানে এই যন্ত্রের কাজ আসলে পারফেক্ট হচ্ছে না। তিনি বলতেন ঠিক বলেছেন এবং তা ঠিক করে নিতেন। গান সম্পর্কে আমার মেধা আর আইকিউ দেখে সত্যি তিনি অবাক হয়েছেন এবং প্রশংসা করেছেন। এটিই গানের ক্ষেত্রে আমার বড় প্রাপ্তি ও স্বীকৃতি।

আপনি তো চলচ্চিত্র আর নাটকের জন্য গল্প ও গান লিখেছেন, এ বিষয়ে কিছু জানতে চাই

‘ভালোবাসি তোমাকে’, ‘বিদ্রোহ চারিদিকে’সহ অনেক ছবির গল্প লিখেছি, অনেক নাটকও রচনা করেছি, এর মধ্যে ৫০০ পর্বের ধারাবাহিক ‘ঘর জামাই’ অন্যতম। অনেক ছবি নাটকের আইডিয়াও আমার। গানও অনেক লিখেছি। এখন দুটি ছবি আর একটি মেগা সিরিয়াল লিখছি। সিরিয়ালটি এক হাজার পর্বের হবে। শুধু লিখা নয়, টেকনিক্যাল দিকেও আমি আমার মেধার স্বাক্ষর রেখেছি। ছোটবেলা থেকে ফটোগ্রাফির প্রতি ঝোঁক ছিল। বাবা দামি ক্যামেরা কিনে দিতেন। যখন আমি এটিএন বাংলা টিভি চ্যানেল প্রতিষ্ঠা করলাম তখন ছোট ছোট হ্যান্ডি ক্যামেরা প্রথম আমি আনালাম। ক্যামেরা দিয়ে শুটের প্রপার টেকনিক বেশ ভালো পারি। আমার টিভি চ্যানেলের ইঞ্জিনিয়ারদের আমি হাতে ধরে কাজ শিখিয়েছি। ইভা রহমানের ৮টি গানের অ্যালবামের ফটোগ্রাফি আমার করা। আমিই প্রথম এদেশে ডলবি সাউন্ড সিস্টেম চালু করি। সফটওয়্যার ব্যবহার না করে ৭ স্পিকারে ম্যানুয়ালি সাউন্ড ব্যবহার করতাম। সিঙ্গাপুর থেকে ডলবি সিস্টেম সাত দিনে শিখেছি আমি। আসলে মাস্টারিংয়ের বিষয়টি সম্পূর্ণ আই কিউর ব্যাপার। আমার এই আইকিউ আছে বলেই সব ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠা পাওয়াটা আমার জন্য সহজ হয়েছে। আইকিউ শার্প না হলে একটি টিভি চ্যানেলকে শীর্ষস্থানে নিয়ে যেতে পারতাম না।

মেগা সিরিয়ালটি কী বিষয় নিয়ে রচনা করছেন?

এটি আমার সংগীতানুষ্ঠান ‘স্মৃতির আলপনায় আঁকি’ শিরোনামেই হবে। এ নাটকের টাইটেল সং হচ্ছে এই সংগীতানুষ্ঠানে আমার গাওয়া ‘চার দেয়ালের মাঝখানে আমি থাকি’ গানটি। এ মাসের শেষদিকে নাটকটির শুটিং শুরু হবে। নাটকের বিষয় হবে লাভ স্টোরি। একটি মুসলিম ছেলে ও হিন্দু মেয়ের প্রেম। যা সমাজ মেনে নেয় না। ডিসেম্বর থেকে নাটকটি অনএয়ারে যাবে। এর সফলতা নিয়ে আমি বেশ আশাবাদী।

গান নিয়ে আপনার আগামী পরিকল্পনা কী?

প্রতি বছর ২/৩ জন শিল্পী উপহার দিতে চাই। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে গানকে পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত ও সম্প্রসারিত করতে চাই। আসলে আমি গাইব এটি বড় কথা নয়, আমি শিল্পী তৈরি করব এটিই আমার মূল পরিকল্পনা।

একজন টিভি চ্যানেলের সফল প্রতিষ্ঠাতা, গল্প, গান রচয়িতা, কণ্ঠশিল্পী এবং সমাজ সেবকের মধ্যে কোন পরিচয়ে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন?

গান হচ্ছে আমার প্রধান হবি। যে বয়সে একজন শিল্পী গান থেকে অবসর নেয় সেই বয়সে আমি গাওয়া শুরু করলাম। গানই হচ্ছে আমার স্বাচ্ছন্দ্যের প্রধান জায়গা, গান নিয়ে আমি এগোতে চাই। আমি আমার লিখা কোনো সিনেমা বা নাটকের শুটিং দেখতে যাই না। কিন্ত গান রেকর্ডিংয়ের সময় উপস্থিত থাকি। যাতে গানিটি প্রপারলি হয় সে দিকে নজর রাখি। আর শিল্পীদের কল্যাণে কাজ করতে পারলে খুব ভালো লাগে। আমাদের দেশে শিল্পীদের পারিশ্রমিক কম বলে একটা সময় যখন তারা কাজ পায় না তখন অসহায় হয়ে পড়ে। তাই শিল্পী নির্মাতাদের কল্যাণে একদিকে আমার চ্যানেলে বিদেশি সিরিয়াল প্রচার করি না। অন্যদিকে আমার কাছে কেউ সহযোগিতা চাইলে তাকে খালি হাতে ফিরাই না। আমি শিল্পী ঐক্যজোট নামে একটি সেবামূলক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত আছি। সংগঠনটি যেভাবে অসহায় শিল্পীদের জন্য কাজ করে যাচ্ছে তার জন্য এর কর্তাব্যক্তিদের ধন্যবাদ জানাই। কারণ তারা আমার স্বপ্ন পূরণ করছে।

সবশেষে আমি বলব আমার গান শুনে কারও আত্মহত্যা করার দরকার নেই। আপনাদের হাতে রিমোর্ট কন্ট্রোল আছে। ভালো না লাগলে অন্য চ্যানেলে চলে যান। তবে আমার ভালো গানের মেধা যে ভোঁতা নয় তা আগামীতে আবারও প্রমাণ করব।

সৌজন্যেঃ বাংলাদেশ প্রতিদিন

হিজড়াদের প্রেম নিয়ে এক করুণ গোপন গল্প

রুদ্র মিজান: সাধ-আহ্লাদ সবই আছে। আছে প্রবল ভালোবাসার অনুভূতি। ঘরবাঁধার স্বপ্নও দেখেন তারা। কিন্তু প্রকৃতির খেয়ালে তাদের রয়েছে সীমাবদ্ধতা। শারীরিকভাবে মিলিত হলেও সন্তানের মুখ দেখতে পান না তারা। তবু ঘর পাতেন। একসঙ্গে সংসার করেন। কিন্তু তাদের সংসার, ঘরবাঁধা ভিন্ন রকমের। তাদের মধ্যে আছে বৈচিত্র্যতা।

প্রত্যেক হিজড়াই একজন পুরুষ সঙ্গী খোঁজেন। পুরুষ সঙ্গীরা তাদের বন্ধু হিসেবে পরিচিত। এই বন্ধুকে ভালোবাসার বন্ধনে বেঁধে রাখতে চান তারা। হিজড়াদের কাছে এই বন্ধু ‘পারিক’ নামে পরিচিত। বেশ কয়েকজন হিজড়ার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে তাদের প্রেম, বিয়ে ও সংসার সম্পর্কে। তাদের জীবন হচ্ছে এক গোপন ট্র্যাজেডি।

৯০ দশকের কথা। পুরান ঢাকার ইংলিশ রোডের তাড়িখানায় নিয়মিত নাচ করতেন রুপালি। তাড়িখানার আগতদের কাছে সুন্দরী হিসেবেই পরিচিত ছিলেন। নানাজনের কাছ থেকে প্রায়ই প্রেমের প্রস্তাব পান তিনি। তাকে বিয়ে করতে চান, সংসার করতে চান। অনেকের মতো পুরান ঢাকায় ওই সময়ে সন্ত্রাসী হিসেবে পরিচিত আরমান নিয়মিত তাড়ি পান করতে যেতেন সেখানে।

তাড়িখানায় রুপালির গান-নৃত্য মুগ্ধ করে তাকে। প্রেমে পড়ে যান আরমান। আর আরমানকেও ভালোবেসে পেলেন রুপালি। রুপালিও স্বপ্ন দেখেন আরমানকে নিয়ে। কিন্তু নিজের দুর্বলতার কথা ভেবে সাহস পান না। শেষ পর্যন্ত আরমান প্রস্তাব দিলে তিনি বলেন, ‘আমি তো হিজড়া’।

আরমান প্রথমে বিশ্বাস করেন না। পরবর্তীতে হিজড়া জেনেই রুপালির সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক গড়েন। ছুটিয়ে প্রেম করেন তারা। তাদের মধ্যে একটা চুক্তি হয়। এই চুক্তিকে ‘বিয়ে’ বলেন হিজড়ারা। এ বিষয়ে জানতে চাইলে রুপালি জানান, কয়েকজনকে সাক্ষী রেখে নোটারি পাবলিকের মাধ্যমে একটি চুক্তি করা হয়। চুক্তিতে উল্লেখ ছিল, দিনের বেলা তিনি নিজের স্ত্রী, সন্তানের সঙ্গে সময় কাটাতে পারবেন। তবে রাতে রুপালির সঙ্গে থাকতে হবে। বিনিময়ে আরমানের সব ভরণ পোষণ রুপালি বহন করবেন।

রুপালি জানান, আরমানকে তিনি নিজের জীবনের চেয়েও বেশি ভালোবাসেন। তাকে কোনো কষ্ট করতে দেন না। তাকে নিয়ে দেশ-বিদেশে বেড়াতে গেছেন অনেকবার। তবে আরমান অন্য কোনো নারীর কাছে যাবেন তা সহ্য হয় না রুপালির। তাই ক্রমান্বয়ে স্ত্রীর কাছ থেকে দূরে সরিয়ে এনেছেন তাকে। দীর্ঘ কয়েক বছর ধরেই দিনে-রাতে রুপালির সঙ্গেই বসবাস করেন আরমান। তবে স্ত্রী-সন্তানকে টাকা পাঠান। সব টাকা দেন রুপালি। আরমনাকে নিয়ে নারায়ণগঞ্জের সাইনবোর্ড এলাকায় বসবাস করছেন রুপালি।

আরেক পারিকের নাম রফিক। তিন বছর আগে রফিকের সঙ্গে ময়না হিজড়ার পরিচয়। ধোলাইপারে চাঁদা তুলতে গেলে ময়নার সঙ্গে পরিচয় রফিকের। ময়না হিজড়া দেখতে সুন্দরী। এতেই আকৃষ্ট হন রফিক। নানা গল্প করেন। একসঙ্গে রিকশায় ঘুরে বেড়ান। এভাবেই ভালো বন্ধুতা গড়ে ওঠে। একসময় ময়না হিজড়ার সঙ্গে শারীরিক সম্পর্কে জড়িয়ে যান। ময়নার শনিরআখড়ার বাসায় রাতযাপন করতেন রফিক।

এরই মধ্যে রফিককে পারিক করে রাখার প্রস্তাব দেন ময়না। সারা জীবনের সঙ্গী করতে চান। রফিক অসম্মতি জানান। এ নিয়ে দুজনের মধ্যে কলহ হয়। অবস্থা বেগতিক দেখে পালিয়ে যান রফিক। ফোন নম্বর পরিবর্তন করেন। অন্যদিকে হন্যে হয়ে রফিককে খুঁজতে থাকেন ময়না। এ বিষয়ে রফিকের চন্দনকোটা এলাকার এক ঘনিষ্ঠজন জানান, সম্প্রতি রফিককে খুঁজতে তার বাসায় যান ময়না। সেখানে গিয়ে রফিককে না পেয়ে তাকে হুমকি দিয়েছেন।

ময়না বলেছেন, রফিককে না এনে দিলে সকল হিজড়া মিলে তাকে অপদস্থ করবে। ওই ঘটনার বর্ণনা দিয়ে তিনি জানান, রফিকের সঙ্গে কি সম্পর্ক জানতে চাইলে ময়না প্রথমে বলেন, ‘রফিক আমার বন্ধু।’ পরে বলেন, ‘রফিক আমার স্বামী।’ কাবিননামা আছে কিনা জানতে চাইলে ময়না বলেন, ‘আমাদের কোনো কাবিননামা লাগে না।’ তবে নোটারি করার বিষয়ে তিনি জানান, সময়ের অভাবে রফিকের সঙ্গে চুক্তিটা করা হয়নি। সূত্রমতে, ময়না হিজড়ার হাত থেকে রক্ষা পেতে এখনো পালিয়ে বেড়াচ্ছেন রফিক।

বনানীর কড়াইল বস্তির হিজড়া মিষ্টি। ১০-১২ বছর বয়সেই নরসিংদীর বাড়ি ও মা-বাবাকে ছেড়ে ঢাকায় আসেন তিনি। থাকেন গুরুমার সঙ্গে।

মিষ্টি জানান, সন্ধ্যার পর সেজেগুজে বের হন। হাতিরঝিল, বিজয় সরণিসহ বিভিন্ন মোড়ে অবস্থান নেন। যৌনকর্মী হিসেবে কাজ করেন। রাত শেষে টাকা নিয়ে বাসায় ফিরে তা তুলে দেন গুরুমার হাতে। বিনিময়ে গুরুমা তার থাকা, খাওয়া, নিরাপত্তার ব্যবস্থা করেন। গুরুমা তার অভিভাবক। তবে পেশাদার যৌনকর্মের বাইরে একজন সঙ্গী বা পারিক খোঁজেন মিষ্টি।

তিনি জানান, প্রত্যেক হিজড়াই নিজেকে নারী ভাবতে পছন্দ করেন। এজন্য একজন পুরুষ সঙ্গী খোঁজেন। সে রকম পারিক এখনো পাননি। তবে তার বান্ধবী জোছনার একজন পারিক আছেন।

মিষ্টি বলেন, ওই পারিক অনেক ভালো। শিক্ষিত। প্রায় রাতেই জোছনাকে নিয়ে বাসায় রাতযাপন করেন। একজন পারিকের সঙ্গে একাধিক হিজড়ার সম্পর্ক হতে পারে কিনা জানতে চাইলে মিষ্টি জানান, তা হতে পারে না। যদি কখনো এরকম হয় তাহলে কঠিন বিচার করেন গুরুমা। এ অপরাধে ওই হিজড়ার জরিমানা হবে। অন্যদিকে পারিককে ভর্ৎসনা করা হবে বলে জানান তিনি। সূত্র: মানবজমিন।

বাংলাদেশে রোহিঙ্গা আশ্রয় দেয়া নিয়ে একি লিখলেন তসলিমা

মানবিকতার জন্য নয়, ভোটের জন্য রোহিঙ্গাদের সরকার আশ্রয় দিচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন বাংলাদেশের নির্বাসিত লেখিকা তসলিমা নাসরিন। সোমবার এক টুইটে তিনি এ অভিযোগ করেন।

এতে লেখিকা প্রশ্ন তুলেছেন, মুসলিম না হয়ে অন্য ধর্মের হলেও কি বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিত?

এই প্রসঙ্গেই দ্বিতীয়বারের মতো তোপ দাগলেন বিতর্কিত লেখিকা তসলিমা নাসরিন। তিনি টুইট করেন, ‘রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়েছে বাংলাদেশ। কিন্তু, যদি রোহিঙ্গারা মুসলিম না হয়ে হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান কিংবা জৈন ধর্মাবলম্বী হত? তাহলে কি হত? মানবিকতার জন্য আশ্রয়দান নয়, এটা আসলে ভোটের জন্য।’

এর আগেও বাংলাদেশের একটি জাতীয় দৈনিকে রোহিঙ্গা ইস্যুতে প্রতিক্রিয়া দেন তসলিমা নাসরিন। সেখানে তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উদ্দেশ্যে বলেছেন, ‘আপনি (শেখ হাসিনা) ভোটের জন্য সব করছেন। ভোটের জন্য রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়েছেন। দেশের মুসলমানদের ভোট পাবেন। রোহিঙ্গারা যদি হিন্দু হতো বা বৌদ্ধ হতো, আপনি কি আশ্রয় দিতেন? খুব সম্ভবত দিতেন না।’

তসলিমা বলেন, ‘দেশের ভেতরেই দেশের হিন্দু নাগরিক যখন নির্যাতত হয়, নিজ ভূমি থেকে উচ্ছেদ হয়, যখন ওদের বাড়িঘর পুড়িয়ে দিয়ে ওদের দেশ ছাড়তে বাধ্য করা হয়, আপনি কি গিয়েছেন ওই নির্যাতিত হিন্দুদের কাছে? এক ফোঁটা চোখের জলও কি ফেলেছেন?’

তিনি বলেন, ‘সংখ্যাগরিষ্ঠদের ভোট পাওয়ার জন্য আমাকে আমার দেশে ঢুকতে দিচ্ছেন না, সংখ্যালঘুদের প্রতি সহানূভুতি দেখাচ্ছেন না, ব্লগারদের মৃত্যুতে সমবেদনাও জানাচ্ছেন না। কিন্তু, অন্য দেশ থেকে আসা শরণার্থীদের জন্য আপনার আবেগ উপচে পড়ছে। ওরা মুসলমান বলেই, অনেকেই নিশ্চিত, ওরা মুসলমান বলেই। শুধু জিততে চাইছেন। শুধু শাসন করতে চাইছেন।’

তসলিমা আরও বলেন, ‘যারা ছলে-বলে কৌশলে শুধু নিজের স্বার্থটাই হাসিল করতে চায়, তাদের আমরা কতটা মুক্তকণ্ঠে মানবতাবাদী বলতে পারি!’